বগুড়ার উন্নয়ন : আঞ্চলিক লাভ, নাকি জাতীয় প্রয়োজন?

বগুড়ার গুরুত্ব সাম্প্রতিক কোনো রাজনৈতিক বাস্তবতার সৃষ্টি নয়, এর ইতিহাস বহু প্রাচীন

বগুড়ার উন্নয়ন : আঞ্চলিক লাভ, নাকি জাতীয় প্রয়োজন?
বগুড়া ও এর আশপাশের এলাকা নিয়ে একটি পরিকল্পিত ও আধুনিক নগর প্রতিষ্ঠার লক্ষে ‘বগুড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকার।

কৃষিবিদ মুহাম্মদ তাহাজ্জত আলী

উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। রাষ্ট্রের অর্থ কোথায়, কেন এবং কীভাবে ব্যয় হচ্ছে তা নিয়ে নাগরিকের প্রশ্ন যেমন গণতান্ত্রিক অধিকার, তেমনি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু প্রশ্নটি যখন অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়ে যায়, এক জেলার উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রগতি হিসেবে স্বাগত জানানো হয়, আর অন্য জেলার উন্নয়নকে রাজনৈতিক আনুকূল্যের ফল হিসেবে দেখা হয়, তখন বিষয়টি উন্নয়নের চেয়ে আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গির সংকটকেই সামনে আনে।

সম্প্রতি বগুড়ার উন্নয়ন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং বিভিন্ন মিডিয়াতে এমন আলোচনা লক্ষ করা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, রাষ্ট্র পরিচালনায় বগুড়ার মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কারণেই জেলাটি এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ধরনের আলোচনা নতুন নয়। আমাদের দেশে ক্ষমতার কেন্দ্র ও আঞ্চলিক উন্নয়নের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন অতীতেও উঠেছে। কিন্তু বগুড়ার ক্ষেত্রে বিতর্কটি ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজন। বগুড়ায় প্রস্তাবিত অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলো কি কেবল একটি জেলার জন্য, নাকি বৃহত্তর অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গেও যুক্ত? বগুড়ার গুরুত্ব সাম্প্রতিক কোনো রাজনৈতিক বাস্তবতার সৃষ্টি নয়। এর ইতিহাস বহু প্রাচীন। মহাস্থানগড়ের পুণ্ড্রনগর প্রাচীন বাংলার রাজধানী সহ গুরুত্বপূর্ণ নগর ও প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলোর একটি। এ অঞ্চলের নগরায়ণের ইতিহাস খ্রিষ্টপূর্ব যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। পরবর্তী সময়েও কৃষি, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগে বগুড়ার গুরুত্ব বজায় ছিল। ব্রিটিশ আমলে প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে এর অবস্থান সুদৃঢ় হয়। স্বাধীনতার পরও শিল্প, কৃষি, ব্যবসা ও পরিবহনের ক্ষেত্রে বগুড়া উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়েছে। বিসিক শিল্পনগরী, সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিস্তার সেই অর্থনৈতিক ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা। তবে সম্ভাবনার তুলনায় বগুড়ার বিকাশ কতটা হয়েছে, সে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। সময়ের সঙ্গে পুরোনো অনেক শিল্পের সক্ষমতা ও জৌলুশ কমেছে; প্রত্যাশিত বৃহৎ বিনিয়োগ এবং আধুনিক যোগাযোগ অবকাঠামোর বিস্তারও সব ক্ষেত্রে ঘটেনি। এর পেছনে নীতিগত অগ্রাধিকার, বাজার, বিনিয়োগ পরিবেশ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সবকিছুরই ভূমিকা থাকতে পারে। ফলে অতীতের উন্নয়ন-ঘাটতি পূরণের কোনো উদ্যোগকে শুধু বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করলে বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতা আড়ালে পড়ে যায়।

প্রশ্নটি তাই অন্যভাবে করা দরকার, দীর্ঘ সময় বগুড়া যদি তার ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার তুলনায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না পেয়ে থাকে, তবে সেই ঘাটতি পূরণের যৌক্তিক সময় কখন? দীর্ঘদিন না পাওয়াটা যদি প্রশ্ন না হয়, এখন পাওয়াটাই বা প্রশ্ন হবে কেন?বগুড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ সম্ভবত তার ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থান। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে বিদ্যমান যোগাযোগের পাশাপাশি পরিকল্পিত পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণ করিডর গড়ে উঠলে বগুড়া বৃহত্তর আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দেশের মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ যেমন আরও কার্যকর হতে পারে, তেমনি নতুন ২য় যমুনা পারাপার সৃষ্টি হলে জামালপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের বিকল্প সংযোগের সম্ভাবনা বাড়বে। সেই নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের সঙ্গে পণ্য ও যাত্রী চলাচলের বিকল্প পথ তৈরির সুযোগও সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে শারিয়াকান্দি–মাদারগঞ্জ দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সম্ভাব্য করিডর বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রকল্পটি অবশ্যই কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু করিডরটি বাস্তবায়নযোগ্য প্রমাণিত হলে এর সুফলকে শুধু বগুড়ার হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। এটি উত্তরাঞ্চল ও জামালপুর-ময়মনসিংহ অঞ্চল সহ নতুন দক্ষিন-পম্চিমাঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ সৃষ্টি করতে পারে এবং জাতীয় সড়ক-রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বিত হলে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। একইভাবে বগুড়ায় কার্যকর বিমান যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হলে কার্গো সুবিধা গড়ে তোলার বিষয়টিও সম্ভাব্যতা ও চাহিদার ভিত্তিতে দ্রুত কাজ শুরু হওয়া প্রয়োজন। বগুড়া ও আশপাশের অঞ্চল কৃষি উৎপাদনের জন্য পরিচিত। আলু, সবজি, মসলা, ফল, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পকে আধুনিক সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সড়ক-রেল ও কার্গো ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে একটি বৃহত্তর কৃষি-লজিস্টিকস ও শিল্প অর্থনীতি গড়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে।

এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সেতু শুধু নদীর দুই পাড়কে যুক্ত করে না; সঠিক পরিকল্পনায় এটি দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চলকে যুক্ত করে। বিমানবন্দর শুধু যাত্রী পরিবহন করে না; উপযুক্ত কার্গো ও লজিস্টিকস ব্যবস্থা থাকলে উৎপাদককে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। তাই কোনো অবকাঠামোর মূল্যায়ন তার অবস্থান দিয়ে নয়, তার অর্থনৈতিক প্রভাব দিয়ে হওয়া উচিত। এই বাস্তবতার সঙ্গে বগুড়াকে বিভাগ করার দাবিও যুক্ত। তবে বিভাগ গঠনের প্রশ্নটি আবেগ বা ঐতিহাসিক মর্যাদায় সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না।

জনসংখ্যা, প্রশাসনিক সেবার দূরত্ব, যোগাযোগব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সরকারি ব্যয়, বিদ্যমান বিভাগের ওপর চাপ এবং কোন কোন জেলা নিয়ে নতুন বিভাগ কার্যকর হবে। এসবের নিরপেক্ষ  মূল্যায়ন প্রয়োজন। সেই মূল্যায়নে বগুড়া উপযুক্ত হলে বিভাগীয় মর্যাদা কোনো রাজনৈতিক পুরস্কার নয়; সেটি হবে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের উন্নয়ন কোনো শূন্য-সমষ্টির প্রতিযোগিতা নয়। কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, গোপালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, সিলেট,চট্রগ্রাম কিংবা বগুড়া—প্রতিটি অঞ্চলের যৌক্তিক উন্নয়নই জাতীয় উন্নয়নের অংশ। একটি জেলা কিছু পেলেই অন্য জেলার প্রাপ্য কমে যাবে, এমন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। বরং ঢাকাকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও প্রশাসনের চাপ কমাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সক্ষম আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর হতে পারে।

তাই প্রশ্নটি বগুড়া কেন পাবে?এখানে আটকে রাখা উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত বগুড়ায় বিনিয়োগ করলে বাংলাদেশ কী পাবে? যদি একটি নতুন যোগাযোগ করিডর কয়েকটি অঞ্চলের দূরত্ব কমায়, কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করে, শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং ঢাকার ওপর অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ কমাতে ভূমিকা রাখে, তাহলে সেই বিনিয়োগ বগুড়ার একার নয়; সেটি জাতীয় সম্পদ। অন্য জেলার উন্নয়নকে ‘উন্নয়ন’ আর বগুড়ার উন্নয়নকে ‘রাজনীতি’ হিসেবে দেখার দ্বৈত মানদণ্ড যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি বগুড়ার নামে অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক প্রকল্প গ্রহণও সমর্থনযোগ্য নয়। মাপকাঠি একটাই হওয়া উচিত প্রয়োজন, সম্ভাব্যতা, অর্থনৈতিক সুফল ও জাতীয় স্বার্থ। বগুড়ার ইতিহাস তার পরিচয় দিয়েছে; ভৌগোলিক অবস্থান দিয়েছে সম্ভাবনা। এখন প্রয়োজন সেই সম্ভাবনাকে তথ্য, পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতার ভিত্তিতে কাজে লাগানো। ব্যক্তি বা দলের রাজনৈতিক সময়কাল পেরিয়ে যায়, কিন্তু সঠিক অবকাঠামো কয়েক প্রজন্মের অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে। বগুড়ার উন্নয়ন তাই শুধু বগুড়ার প্রশ্ন নয়; সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এটি হতে পারে উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক বিকাশ, আন্তঃআঞ্চলিক সংযোগ এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন বিকেন্দ্রীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

(কৃষিবিদ মুহাম্মদ তাহাজ্জত আলী একজন ব্যাংকার ও কলাম লেখক।)