৬০০ বছরের ঐতিহ্যের ধারক হবিগঞ্জের শংকরপাশা শাহী জামে মসজিদ
অপরূপ সৌন্দর্যের পুরাকীর্তি নকশায় সাজানো হবিগঞ্জের শংকরপাশা শাহী জামে মসজিদটি ৬০০ বছর ধরে ঐতিহ্যের ধারক হয়ে আছে। সৃষ্টির পর থেকে এ মসজিদের কোন ধরনের সংস্কার হয়নি। প্রত্মতত্ত্ব বিভাগ এটির নিয়ন্ত্রণ নেয়ায় কোন ধরনের সংস্কার কাজ করতে পারছেন না স্থানীয়রাও। মসজিদটি দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা দর্শনার্থীরা।
উৎকীর্ণ শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, ১৫১৩ সালে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হওয়া এই মসজিদটি নির্মাণ করেন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহ মজলিশ আমিন; মসজিদের পাশেই আছে তার মাজার। কালের বিবর্তনে এক সময় মসজিদ সংলগ্ন এলাকা বিরান ভূমিতে পরিণত হয়ে জঙ্গলবেষ্টিত হয়ে পড়লেও পরবর্তীকালে এলাকায় জনবসতি গড়ে উঠলে জঙ্গলে আবাদ করতে গিয়ে বের হয়ে আসে মসজিদটি। খবর: বাসস।
শংকরপাশা শাহী জামে মসজিদের পার্শ্ব দৃশ্য। ছবি: উইকিপিডিয়া
স্থানীয়রা জানান, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ’র শাসনকালে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার রাজিউড়া ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামে শাহী জামে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। শুরুতে মসজিদের নাম শংকরপাশা শাহী জামে মসজিদ নামকরণ করা হলেও বর্তমানে এর নামকরণ করা হয়েছে উচাইল শাহী জামে মসজিদ।
দূর থেকে দেখলে যে কারও দৃষ্টি কাড়ে ঐতিহ্যবাহী লাল টকটকে এ মসজিদটি। এর চারপাশ ঘিরে রয়েছে কবরস্থান। মসজিদের দক্ষিণে রয়েছে হজরত শাহ জালাল (রহ.) এর সফরসঙ্গী হজরত শাহ মজলিস আমিন (রহ.) এর মাজার। প্রায় প্রতিদিনই এখানে মাজার জিয়ারত ও মসজিদ দেখতে আসেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজন।
এটি একটি এক চালা ভবন। ভবনটি দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ একই মাপের, যা ২১ ফুট ৬ ইঞ্চি। এর সম্মুখের বারান্দাটির প্রস্থ তিন ফুটের সামান্য বেশি। এতে চারটি গম্বুজ রয়েছে; মূল ভবনের উপর একটি বিশাল গম্বুজ এবং বারান্দার উপর রয়েছে তিনটি ছোট গম্বুজ। মসজিদটিতে মোট ১৫টি দরজা ও জানালা রয়েছে যা পরস্পর সমান আকৃতির প্রায়। পূর্ব-উত্তর-দক্ষিণ - এই তিন দিকের দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় পাঁচ ফুট এবং পশ্চিমেরটি প্রায় দশ ফুট। এতে মোট ছয়টি কারুকার্য শোভিত স্তম্ভ আছে প্রধান কক্ষের চারকোণে ও বারান্দার দুই কোণে। উপরের ছাদ আর প্রধান প্রাচীরের কার্নিশ বাঁকানোভাবে নির্মিত। মসজিদের দক্ষিণ পার্শ্বে একটি বড় দীঘি রয়েছে।
প্রাচীন আমলের নানান কারুকাজে সাজানো রয়েছে এর ভেতর ও বাইরের অংশ। দেয়ালের বিভিন্ন অংশে আরবি হরফে লেখা রয়েছে যা অস্পষ্ট। আর মসজিদের এসব কারুকাজ দেখে যে কারোরই চোখ জুড়িয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরেই মসজিদের কোন সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
প্রকৃতপক্ষে স্থানীয়রা কত বছর পূর্বে এ মসজিদটি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তার সঠিক তথ্য জানেন না। মসজিদটির দেয়াল ৫ ফুট প্রশস্ত, রয়েছে ৪টি গম্বুজ, কিন্তু এর কোন মিম্বর নেই। মসজিদের ভেতরে একসাথে মাত্র ৪০ ও বারান্দায় আরো ১০ জন মুসুল্লি নামাজ পড়তে পারে।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা মসজিদটি সংস্কারের দাবি জানান। তারা মনে করেন প্রাচীন ঐতিহ্য এ মসজিদটি সংস্কারের পাশাপাশি যাতায়াতের সুবিধা নিশ্চিত করা হলে প্রাচীন এ মসজিদটি ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।
প্রাচীনকালের জটিল কারুকার্য দ্বারা সজ্জিত মসজিদের দেয়ালের একটি অংশ। ছবি: উইকিপিডিয়া
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মালেকের সাথে কথা হলে তিনি জানান, মসজিদটি এখন সংস্কার করা প্রয়োজন। সংস্কার করা হলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আরো পর্যটকরা আসবে। হবিগঞ্জ থেকে আসা জসিম উদ্দিন জানান, আমি প্রবাসে থাকি। ইন্টারনেটের মাধ্যমে এ মসজিদের বিষয়ে জানতে পেরেছি, তাই আজ এসে মসজিদটি বাস্তবে দেখলাম। খুবই সুন্দর ও নান্দনিক।
মসজিদে ৪৫ বছর ধরে ইমামতি করছেন মো. বজলুল হক। তিনি জানান, মসজিদের ইতিহাস কেউই সঠিকভাবে বলতে পারে না। অনেকেই গায়েবি মসজিদ বলে, তবে আমি শুনেছি শাহ আলাউদ্দিন হুসেন শাহর আমলে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। সর্বশেষ এরশাদ সরকারের আমলে মসজিদটি সংস্কার করা হয়। এরপর আর কোন সংস্কার করা হয়নি। এখন সংস্কারের প্রয়োজন।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বাদল জানান, মসজিদটি সংস্কার করা প্রয়োজন। সংস্কার করা হলে এর সৌন্দর্যের পাশাপাশি পর্যটকের সংখ্যাও বাড়বে। তিনি বলেন, মসজিদের বাউন্ডারির কাজ বাকি, এছাড়া সামনের অংশে কিছু মেরামত করতে পারলে আরো বেশি বেশি করে দর্শনার্থী আসবে।
