থার্ড টার্মিনাল নিয়ে আইনি জটিলতা ও আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে নতুন সরকার

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের মুকুটমনি। কিন্তু এর ঝকঝকে মেঝে আর আলোহীন ব্যাগেজ ক্যারোজেলের আড়ালে এটি নীরবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার এক মূর্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক সালিশী বোর্ড (Dispute Board/DB) এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়ামের (ADC) পাওনা বাবদ বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (CAAB) ১,৫০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে।

থার্ড টার্মিনাল নিয়ে আইনি জটিলতা ও আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে নতুন সরকার
রাতের সময়ে তোলা থার্ড টারমিনাল এর ছবি ATT FILE PHOTO

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড বা তৃতীয় টার্মিনাল (T3) হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের মুকুটমনি। বিশ্বমঞ্চে জাতি কী অর্জন করতে পারে তার একটি জীবন্ত প্রমাণ। তবে এর ঝকঝকে মেঝে আর আলোহীন ব্যাগেজ ক্যারোজেলের আড়ালে এটি নীরব আমলাতান্ত্রিক জটিলতার এক মূর্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

গত সপ্তাহে একটি আন্তর্জাতিক ডিসপুট বোর্ড (DB) বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে (CAAB) এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়ামকে (ADC) ১,৫০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে। প্রকাশ্যে কর্মকর্তারা অস্পষ্ট 'অডিট আপত্তির' আড়ালে লুকিয়ে এটিকে একটি সাধারণ চুক্তিভিত্তিক মতানৈক্য বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

তবে 'এভিয়েশন অ্যান্ড ট্যুরিজম টাইমস'-এর দীর্ঘ অনুসন্ধান যা গোপন নথিপত্র এবং কনসোর্টিয়ামের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের দ্বারা সমর্থিত আরও বেশি উদ্বেগজনক একটি সত্য উন্মোচন করেছে। এটি কোনো আইনি অনিবার্য পরিণতি ছিল না। এটি ছিল আমাদের এভিয়েশন নেতৃত্বের নিছক অহংকার থেকে সৃষ্ট একটি স্ব-আরোপিত আর্থিক রক্তক্ষরণ। এ এমন এক বিপর্যয় যা মাত্র অল্প খরচে পুরোপুরি এড়ানো যেত।

আসল অপরাধ : একটি সাফল্যের শাস্তি
এই ব্যর্থতার গভীরতা বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে দেখতে হবে কীভাবে এই সংকটের শুরু হয়েছিল। পরিতাপের বিষয় হলো এর শুরুটা হয়েছিল একটি সাফল্য দিয়ে। কোভিড-১৯ মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বৈশ্বিক ধ্বংসযজ্ঞ সত্ত্বেও এডিসি (ADC), যাতে রয়েছে জাপানের মিতসুবিশি ও ফুজিতা কর্পোরেশনের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং সিঅ্যান্ডটি (Samsung C&T)। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে তৃতীয় টার্মিনালের ভৌত নির্মানকাজ সম্পন্ন করে, যার চূড়ান্ত রূপ ছিল সেই বহুল উদযাপিত 'সফট উদ্বোধন'।

এর পরবর্তী যৌক্তিক পদক্ষেপ ছিল একটি মসৃণ হস্তান্তর এবং সরকারের দায়িত্ব ছিল টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য কোনো থার্ড-পার্টি বা তৃতীয় পক্ষের অপারেটর নিয়োগ দেওয়া। কিন্তু তারা তা করতে ব্যর্থ হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এডিসি-র ভেতরের একজন স্বীকার করেছেন, "যেহেতু কোনো উপযুক্ত হ্যান্ডেলিং এবং অপারেটিং কোম্পানি কখনোই নিয়োগ দেওয়া হয়নি, তাই আমরা কেয়ারটেকার বা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হয়েছি। আমাদেরকে বছরের পর বছর ধরে একটি মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়েছে, যে কাজটি আমাদের প্রাথমিক চুক্তির আওতার সম্পূর্ণ বাইরে ছিল। এই স্থাপনাটিকে নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে আমাদের পরিচালন ব্যয়ের রক্তক্ষরণ হচ্ছিল।"

প্রস্তাবিত সমাধান
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে। এডিসি একটি সোজা এবং অত্যন্ত যৌক্তিক প্রস্থান কৌশল নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে যায়। তারা তাদের বকেয়া সার্টিফায়েড বিল নিষ্পত্তির পাশাপাশি ২০২৪ সাল থেকে তাদের কাঁধে চেপে বসা বিশাল চুক্তি-বহির্ভূত রক্ষণাবেক্ষণ খরচের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল। এটি মীমাংসা হলেই তারা টার্মিনালটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করত। এই বর্ধিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় মেটানো এবং সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে বিদায় নেওয়ার জন্য এডিসি তাদের প্রাথমিক চুক্তিমূল্যের ওপর মাত্র ৫% অতিরিক্ত ফি দাবি করেছিল।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (CAAB) এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় (MoCAT) এই কূটনৈতিক সমাধানের কী জবাব দিয়েছিল? তারা মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়। কনসোর্টিয়ামের একাধিক সূত্রের মতে, অর্থ পরিশোধ করার পরিবর্তে ক্যাব (CAAB) এডিসির বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বিল করার ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলে। তারা কনসোর্টিয়ামের ন্যায্য পাওনাকে একটি জটিলতাপূর্ণ, অনির্দিষ্টকালের "অডিট" পর্যায়ে আটকে রাখে।

এডিসি-র একজন সিনিয়র সূত্র আমাদের বলেছেন, "আমরা ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অফ কমার্সে (ICC) না গিয়ে বা ডিসপুট বোর্ড গঠন না করেই বিষয়টি নীরবে সমাধানের জন্য একাধিকবার চেষ্টা করেছি।" এডিসির একজন সিনিয়র কনসালটেন্ট আমাদের জানান, "ক্যাব এবং মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এর সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন।" পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরতে তারা এমনকি কোরিয়ান দূতাবাসসহ অন্যান্য কূটনৈতিক চ্যানেলও ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু কোনো ভ্রুক্ষেপ করা হয়নি এবং এই সংকটের গভীরতাকে স্রেফ উপেক্ষা করা হয়েছে।

কূটনৈতিক বধিরতা
এই অসহযোগিতা একটি কূটনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়। কনসোর্টিয়ামের নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্বকারী রাষ্ট্রদূতরা এভিয়েশন উপদেষ্টাকে জরুরি চিঠি লিখে সতর্ক করে দেন যে, আনুষ্ঠানিকভাবে স্থাপনাটির দ্বায়িত্ব বুঝে না নেওয়া এবং সার্টিফায়েড পাওনা পরিশোধে ব্যর্থতা ঠিকাদারকে আইনি ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারা স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছিলেন যে, এটি বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং ভবিষ্যতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগকে (FDI) নিরুৎসাহিত করবে। তবুও, আমাদের নেতৃত্ব সিদ্ধান্তহীনতা এবং অহংকারে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে ছিল; ঠিকাদারের প্রতি তারা যে অবজ্ঞা দেখিয়েছিল, বিদেশি কূটনৈতিক সতর্কবার্তার প্রতিও তারা একই আচরণ করে।

ডিবির শাস্তির খাঁড়া
যখন নেতৃত্ব বাস্তবতাকে অস্বীকার করে, তখন আন্তর্জাতিক সালিশি তা তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়। সমস্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য এবং জার্মানির বিচারকদের সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক ডিসপুট বোর্ড (DB) গঠিত হয়। গত সপ্তাহে ঢাকায় দেওয়া তাদের রায়টি জাতীয় কোষাগারের জন্য একটি বিপর্যয়কর আঘাত। কারণ ক্যাব প্রস্তাবিত ৫%-এ মীমাংসা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, আর তাই ডিবি এমন একটি রায় ঘোষণা করেছে যা কার্যকরভাবে বাংলাদেশকে প্রাথমিক চুক্তিমূল্যের প্রায় ১৫% অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য করছে।

'এভিয়েশন অ্যান্ড ট্যুরিজম টাইমস'-এর একচেটিয়াভাবে পাওয়া ডিবি-র প্রকৃত 'সামারি অফ ডিসিশন' (Summary of Decision) নথিতে কোনো অস্পষ্টতা নেই। এটি তীব্র ডলার সংকটের এই সময়ে ক্যাবকে বিপুল পরিমাণ অর্থ, যার বড় অংশই বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধের নির্দেশ দেয়:

অন্তর্বর্তীকালীন পেমেন্ট সার্টিফিকেটের জন্য (IPCs 48, 52-54): ৫.৮ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন এবং ২.৭ বিলিয়ন টাকারও বেশি রিটেনশন মানি ছাড়ের জন্য: ৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন এবং ৪ বিলিয়ন টাকারও বেশি। ফাইন্যান্সিং চার্জের জন্য (৩১ অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত লেট ফি): ২২২ মিলিয়ন জাপানি ইয়েন এবং ২৯৯ মিলিয়ন টাকা। ৫% মীমাংসার সুযোগ উপেক্ষা করে, আমাদের এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ মূলত আমলাতান্ত্রিক অহংকারের জন্য বাংলাদেশের করদাতাদের ওপর ১০% জরিমানার চপেটাঘাত করেছে।

নেতৃত্বের সংকট
১,৫০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এই বিশাল ভুল আমাদের এভিয়েশন নেতৃত্বের মূল কাঠামোটিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। টার্মিনাল ৩-এর এই বিরোধ শুধু কোনো প্রশাসনিক ভুল নয়; এটি ক্যাব এবং মন্ত্রণালয়ের সেই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এক জ্বলন্ত অভিযোগপত্র, যারা একজন বিদেশি অংশীদারের আন্তরিকতা স্বীকার করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা দূতাবাসগুলোকে দূরে ঠেলেছেন, জনগণের অর্থ নিয়ে জুয়া খেলেছেন এবং বিদেশি বিনিয়োগের (FDI) ক্ষেত্রে দেশের সুনামকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন।

আমাদের এখন একটি বিশ্বমানের টার্মিনাল রয়েছে, যা সম্পূর্ণ খালি পড়ে আছে এবং এক বিশ্বমানের আইনি বিপর্যয়ের শেকলে বাঁধা। বাংলাদেশ যদি সত্যিই আকাশ জয় করতে চায়, তবে সবার আগে আমাদের মাটিতে নিজেদের ঘর গোছাতে হবে। যে কর্মকর্তারা একটি ৫% সৌহার্দ্যপূর্ণ মীমাংসাকে ১,৫০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এক আন্তর্জাতিক অপমানে পরিণত হতে দিয়েছেন, তাদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।