শেরপুরের মুঘল-আমলের স্থাপনা ঘাঘড়া খান বাড়ি জামে মসজিদ
মুঘল শাসনামলে নির্মিত এই এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদের নির্মাণকাল দরজায় সংযুক্ত একটি পাথরের ফলকে আরবিতে খোদাই করা আছে। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে তা ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার ঘাঘড়া লস্কর গ্রামে অবস্থিত ৪০০ বছরের পুরনো মুঘল আমলের স্থাপত্য নিদর্শন ঘাঘড়া খান বাড়ি জামে মসজিদ। ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাটি অতীত ও বর্তমানের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। একদিকে এটি ধর্মীয় পবিত্র স্থান অন্যদিকে ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে পর্যটকদের জন্য ।
ঐতিহাসিক পটভূমি
মুঘল শাসনামলে নির্মিত এই এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদের নির্মাণকাল দরজায় সংযুক্ত একটি পাথরের ফলকে আরবিতে খোদাই করা আছে। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে তা ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। স্থানীয় জনশ্রুতি ও স্থাপত্য নিদর্শন থেকে ধারণা করা হয়, বক্সার বিদ্রোহী নেতা হিরঙ্গী খানের সময়কালে মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আজিমুল্লাহ খান এর প্রতিষ্ঠাতা বলে মনে করা হয়। চার শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়েও মসজিদে এখনো নামাজ আদায় করা হয়।
স্থাপত্যশৈলী
প্রায় ৩০ ফুট দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের এই মসজিদটির কেন্দ্রীয় গম্বুজটিকে ঘিরে রয়েছে ১০টি ছোট-বড় মিনার, যা গ্রামীণ প্রাকৃতিক দৃশ্যের পটভূমিতে এক অনন্য সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। ভেতরের অংশে দুটি শক্তপোক্ত খিলান, মিহরাব এবং একসময় নানা রঙে রাঙানো ফুল ও ফুলদানির নকশা চোখে পড়ে। ঐতিহ্যবাহী চুন ও সুরকির মিশ্রণে নির্মিত চার ফুট পুরু দেয়াল সে সময়ের উন্নত নির্মাণ কৌশলের সাক্ষ্য বহন করে। স্থাপত্য ইতিহাসবিদদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে গ্রিক ও করিন্থীয় রীতির প্রভাব লক্ষণীয়, যা মসজিদটিকে অন্যান্য স্থাপনা থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করেছে।
কাঠামো ও ধারণক্ষমতা
মোট ৫৬ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত মসজিদটির মূল ভবন ও বারান্দার আয়তন ১৬ শতাংশ। বাকি ৪১ শতাংশ জায়গা ব্যবহৃত হচ্ছে কবরস্থান হিসেবে। ভেতরের অংশে তিন কাতারে প্রায় ৩০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। খোলা বারান্দা ও চত্বরে বড় জামাতেও প্রায় ১০০ জনের মতো অতিরিক্ত মুসল্লি স্থান পায়। মসজিদ সংলগ্ন দুটি পুকুরের আয় দিয়ে এর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় নির্বাহ করা হয়।
সংরক্ষণ অবস্থা
ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকার করে ১৯৯৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদটির সংরক্ষণের দায়িত্ব নেয় এবং এটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। তবে সাম্প্রতিক সংরক্ষণ প্রচেষ্টা স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। একসময় নানা রঙে সজ্জিত মসজিদের অভ্যন্তরভাগ সম্পূর্ণ সাদা রঙে রাঙিয়ে দেওয়ায় মূল স্থাপত্যশৈলীর অনেকটা আবেদন নষ্ট হয়ে গেছে বলে মনে করেন স্থানীয় অভিভাবকরা।
ঐতিহাসিক নিদর্শন
প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এই ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখতে আসেন, অনেকে নামাজও আদায় করেন। শেরপুর শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মসজিদটি কয়েরুট সড়ক থেকে পশ্চিমে দুই কিলোমিটার গ্রামীণ পথ পেরিয়ে মাঠের মধ্যে চোখে পড়ে। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য ইমাম ও মুয়াজ্জিন নিযুক্ত আছেন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
স্থাপনাটি চমৎকার ঐতিহাসিক নিদর্শন হলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ উদ্যোগের অভাবে এটি এখনো পূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হতে পারেনি। মুঘল আমলের মূল কারুকাজ পুনরুদ্ধার করে এটিকে একটি জীবন্ত ঐতিহ্যবাহী স্থানে রূপান্তরিত হবে । ঘাঘড়া খান বাড়ি জামে মসজিদ শেরপুরের একটি প্রধান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
