রাঙামাটি : পাহাড় এবং হ্রদের মিলনমেলা

রাঙ্গামাটিতে ছুটি কাটাতে আসা পর্যটকদের জন্য একটি সম্পূর্ণ নির্দেশিকা

রাঙামাটি : পাহাড় এবং হ্রদের মিলনমেলা
রাঙ্গামাটি শহরের দৃশ্য। ছবি: উইকিপিডিয়া

চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত রাঙামাটি বাংলাদেশের একটি অপরূপ জেলা। নির্মল প্রাকৃতিক দৃশ্য, হ্রদের নীল পানি, সবুজ পাহাড় এবং বৈচিত্র্যময় উপজাতীয় সংস্কৃতির লীলাভূমি এটি। দীর্ঘ ছুটির সময় পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে, আর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে জনপ্রিয় সাজেক ভ্যালিতে।

রাঙামাটির উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্য; দক্ষিণে বান্দরবান; পূর্বে মিজোরাম; এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি। আয়তনে এটি দেশের সবচেয়ে বড় জেলা। এটি দেশের একমাত্র রিকশামুক্ত শহর, একটি হ্রদবেষ্টিত পর্যটন নগরী। এই জেলায় চৌদ্দটি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস, যাদের মধ্যে আছে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা,মুরং, বম, খুমি, খেয়াং, চাক, পাংখোয়া, লুসাই, সুজেসওতাল, রাখাইন এবং শেষে বাঙালিরা।

এই জেলার প্রশাসনিক উপজেলাগুলো হলো বাঘাইছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি, কাপ্তাই, কাউখালী, লংগদু, নানিয়ারচর, রাজস্থলী ও রাঙ্গামাটি সদর।

কাপ্তাই হ্রদ

কাপ্তাই হ্রদ নীল জলের এক বিশাল বিস্তৃতি, যা শত শত বর্গকিলোমিটার জুড়ে অবস্থিত। ছবি : উইকিপিডিয়া

কাপ্তাই হ্রদ বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের রাঙামাটি জেলার একটি কৃত্রিম হ্রদ। ৬০-এর দশকে কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে তৈরি কাপ্তাই হ্রদ নীল জলের এক বিশাল বিস্তৃতি, যা শত শত বর্গকিলোমিটার জুড়ে অবস্থিত। কিন্তু এটি কোনো সাধারণ হ্রদ নয়। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি নিচু উপত্যকাগুলোকে নিমজ্জিত করে ফেলে, আর সবচেয়ে উঁচু পাহাড়গুলোর চূড়াগুলো পানির ওপরে ভেসে থাকে। ফলস্বরূপ সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য দ্বীপের এক মনমুগ্ধকর  দৃশ্য, কিছু ছোট, কিছু এত বড় ।

প্রকৃতি প্রেমিরা নৌকা ভাড়া করে হ্রদের জলে ভাসতে ভাসতে চারপাশটা দেখে নেওয়া যাবে। পাহাড় থেকে হ্রদের সৌন্দর্য দেখতে কাপ্তাই হ্রদ প্যারাডাইস পিকনিক স্পট থেকে ঘুরে আসা যাবে। দল বেঁধে নৌ বিহার কিংবা প্যাডেল বোটে চড়ে হ্রদ ভ্রমণ করার সুযোগও রয়েছে এখানে।

ঝুলন্ত সেতু

লম্বা, দুলতে থাকা সেতুটি মূল সড়ককে হ্রদের একটি শাখার ওপারের প্রত্যন্ত উপজাতীয় গ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ছবি: উইকিপিডিয়া

রাঙামাটি শহরে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ—ঝুলন্ত সেতু। ১৯৮৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতুটি নির্মাণ করে। পরে এটি রাঙামাটি পর্যটন করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেতুটি নির্মাণের পর সারা দেশ থেকে পর্যটকেরা এটি দেখতে ছুটে আসতে শুরু করেন।

এখনো সেতুটি দেখতে প্রতিদিন ৫০০ থেকে এক হাজার দর্শনার্থী আসেন এবং প্রতিবছর অন্তত অর্ধকোটি টাকা আয় হয় বলে জানিয়েছে পর্যটন করপোরেশন।

সাজেক ভ্যালি

মেঘ-পাহাড় পর্বতশ্রেণীতে অবস্থিত সাজেক। ছবি: উইকিপিডিয়া

সাজেক ভ্যালি জেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত। মেঘ-পাহাড় পর্বতমালায় অবস্থিত সাজেক একটি অত্যন্ত জনাকীর্ণ পর্যটনকেন্দ্র  । ছুটির দিনগুলোতে শীতের আবহাওয়া উপভোগ করতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩,০০০ পর্যটক সাজেকে ভ্রমণ করেন।

শুভলং জলপ্রপাত

শুভলং জলপ্রপাত ছবি: উইকিপিডিয়া

প্রধান শহর থেকে অল্প দূরের নৌকাযাত্রায় অবস্থিত শুভলং একটি দৃষ্টিনন্দন জলপ্রপাত, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে (জুলাই-অক্টোবর)। শুষ্ক শীতে এর ধারা কমে গেলেও আশপাশের এলাকা, চুনাপাথর ও ঘন বাঁশঝাড়গুলি একটি সুন্দর পিকনিক স্পট হিসেবে রয়ে যায়।

উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট ও জাদুঘর

রাঙ্গামাটিকে তার সৌন্দর্যের বাইরেও বুঝতে হলে এই জাদুঘরটি দেখুন। এখানে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, বাদ্যযন্ত্র, অস্ত্র এবং শিল্পকর্মের এক চিত্তাকর্ষক সংগ্রহ সংরক্ষিত আছে। এটি তাদের অনন্য, জুম চাষ, বৌদ্ধ বিশ্বাস এবং তাদের প্রাণবন্ত ইতিহাসের কাহিনি বলে।

স্থানীয় খাবার

বাঁশের মুরগি, কাঁকড়া ভাজা, মিষ্টি পানির মাছ, বাদামি চাল, জুম  চাল-পর্যটকদের কাছে এসব উপজাতীয় খাবার খুব জনপ্রিয়।

ভ্রমণের উপযুক্ত মৌসুম

শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) ভ্রমণ করার ভালো সময় । আকাশ পরিষ্কার, বাতাসে তাজা ভাব আর পাহাড়গুলো উজ্জ্বল সবুজে সাজানো থাকে। বর্ষা মৌসুমে (জুন-সেপ্টেম্বর) জলপ্রপাতগুলো পূর্ণ প্রবাহে থাকে, কিন্তু তখন হ্রদে নৌকা চালনা বিপজ্জনক ।

ঢাকা থেকে যাওয়ার উপায়

ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটিতে সরাসরি বাসে যাওয়া যায় (চট্টগ্রাম হয়ে প্রায় ৫-৬ ঘন্টা)। অথবা চট্টগ্রামে বিমানে উড়ে গিয়ে সেখান থেকে বাস বা ট্যাক্সি নিয়ে পাহাড়ি পথে আরও প্রায় ৩ ঘন্টার যাত্রায় রাঙ্গামাটি পৌঁছানো যায়।

কোথায় থাকবেন

রাঙ্গামাটি শহরে ঝুলন্ত সেতু, পলওয়েল পার্ক ও বিভিন্ন লেকফ্রন্ট এলাকায় রিসোর্ট আছে। সাজেক কটেজ ওনার্স এসোসিয়েশন জানিয়েছে, সাজেকে বর্তমানে প্রায় ১৪০টি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ এবং ১৪টির বেশি রেস্তোরাঁ আছে।