বরগুনা : প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের এক নতুন সম্ভাবনা

ঘন ম্যানগ্রোভ, উপকূলের লাল কাঁকড়া, পাখির ডাক আর দিগন্তের সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে

বরগুনা : প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের এক নতুন সম্ভাবনা
টেংরাগিরি ইকোপার্কের সমুদ্র সৈকতের নির্মল তীররেখা—দক্ষিণ বাংলাদেশের উপকূলে এক প্রশান্ত নিভৃত অভয়ারণ্য। ছবি: মাইন্ডট্রিপ

বরগুনা জেলা বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা একটি উপকূলীয় জেলা, যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ম্যানগ্রোভ বন এবং শান্ত সমুদ্র সৈকতের জন্য বিখ্যাত। এছাড়া এটি দক্ষিণবঙ্গের একটি অন্যতম প্রধান মৎস্য কেন্দ্র, যেখানে প্রচুর তাজা মাছ ও শুঁটকি পাওয়া যায় । বরগুনা জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো; সোনাকাটা সমুদ্র সৈকত, লালদিয়া বন, টেংরাগিরি ইকোপার্ক, হরিণঘাটা পর্যটন কেন্দ্র,
 রাখাইন পল্লী, শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত, বিবিচিনি মসজিদ ইত্যাদি।

বনাঞ্চল ও সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য সাধারণত শীতকাল উপযুক্ত সময়। তবে এটি উপকূলীয় অঞ্চল, তাই ভ্রমণকালে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে যাওয়া উচিত।

টেংরাগিরি ইকোপার্ক

বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলা থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরে সোনাকাটা ইউনিয়নে সুন্দরবনের একাংশের বিশাল বনভূমি নিয়ে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য টেংরাগিরি ইকোপার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। টেংরাগিরি ইকোপার্কের পাশে আরেকটি পর্যটন আকর্ষণ সোনাকাটা সমুদ্র সৈকত অবস্থিত। ১৯৬০ সালের ১২ জুলাই সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে ঘোষণাকৃত এই বনাঞ্চলটি স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে ফাতরার বন নামে পরিচিত হলেও ১৯৬৭ সালে বনাঞ্চলটিকে টেংরাগিরি বন হিসেবে নামকরণ করা হয়। সুন্দরবনের পর এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল, যা দিনে দুইবার জোয়ার ভাটায় প্লাবিত হয়। লবনাক্ত ও মিষ্টি মাটির অপূর্ব মিশ্রণের কারণে এই বনে রয়েছে বিলুপ্তি প্রজাতির অসংখ্য সারি সারি গাছ, পশু পাখি ও সরীসৃপ প্রাণী। টেংরাগিরির সবুজ ঘন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, সৈকতের তটরেখায় লাল কাঁকড়াদের ছুটোছুটি, পাখির কলকাকলি ও শেষ বিকেলের দিগন্ত রেখায় সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য যেকোনো পর্যটকদের মুগ্ধ করার মতো। 
এখানে বন বিভাগের রেস্ট হাউজ ও পিকনিক কর্নার রয়েছে ।

লালদিয়া বন দর্শনার্থীদের জন্য উপকূলীয় বন্য পরিবেশের এক অপরূপ দৃশ্য দেখার সুযোগ দেয়।
ছবি: এশিয়ান এজ

লালদিয়া বন ও সমুদ্র সৈকত

লালদিয়া বন ও সমুদ্র সৈকত বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণে অবস্থিত। সুন্দরবনের বরগুনা  অংশে অবস্থিতে হরিণঘাটার ভেতর দিয়ে ঘণ্টা দুয়েক পায়ে হেঁটে এগিয়ে গেলে লালদিয়ার বন চোখে পড়ে। লালদিয়া বনের পূর্ব দিকে বিশখালী এবং পশ্চিম দিক দিয়ে বলেশ্বর নদী বয়ে গেছে। দুই নদী এবং সাগরের মোহনায় ঘেরা এ বনের পূর্ব প্রান্তে রয়েছে সমুদ্র সৈকত। আয়তনে ছোট হলেও এ সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য্য কোন অংশেও কম নয়। লালদিয়া বনের পাখির কলরব, সমুদ্রের বুনো সৌন্দর্য্য, গাংচিল আর লাল কাকড়ার ছুটে চলা ভ্রমণ পিয়াসী মনকে প্রকৃতির সাথে একাত্ম করে দেয়।

লালদিয়া সমুদ্র সৈকতের পাশে একটি শুটকি পল্লী রয়েছে। কার্তিক থেকে ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত এখানে শুঁটকি চাষ করা হয়, যা ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে। তবে এখানে প্রস্তুতকৃত শুটকির ৯০ ভাগ হাঁস-মুরগির খাদ্যের জন্য ব্যবহৃত হয়।

হরিণঘাটা পর্যটন কেন্দ্র—সুন্দরবনের বন্য সৌন্দর্য ও শান্ত নদীমোহনার এক প্রবেশদ্বার। ছবি: লোকাল গাইডস কানেক্টস/কামাল হোসেন

হরিণঘাটা পর্যটন কেন্দ্র

প্রাকৃতিক বন আর সাগর হাতছানিতে মুগ্ধ হতে ঘুরে আসতে পারেন দক্ষিণ বরগুনা জেলায় অবস্থিত হরিণঘাটা পর্যটন কেন্দ্র থেকে। জানা-অজানা গাছ আর বন্যপ্রাণীর এই বিচরণস্থল সুন্দরবনেরই একটি অংশ। হরিণঘাটা বনের কাছ দিয়ে বয়ে চলা বলেশ্বর, বিষখালি এবং পায়রা নদী বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। যান্ত্রিক কোলাহলের বাইরে পাখির কলকাকলিতে প্রকৃতির নৈস্বর্গিকতায় দেখা হয়ে যেতে পারে হরিণ, বানর, শূকরসহ অন্যান্য বন্য প্রাণীর সঙ্গে। অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগের জন্য এ বনে রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার।

বরগুনার শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকতের অপরূপ দৃশ্য—পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর মিলনস্থল, যেখানে তিন নদী একসঙ্গে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। ছবি: ভ্রমন গাইড/মিজানুর

শুভ সন্ধ্যা সমুদ্র সৈকত 

বরগুনার প্রধান তিনটি নদী পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বরের মিলিত জলমোহনায় সৈকতটি দাঁড়িয়ে আছে অনন্ত যৌবনা রূপ নিয়ে। বেলাভূমিটি প্রায় চার কিলোমিটার লম্বা এলাকাজুড়ে বিস্তৃত।  তালতলী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে সোনাকাটা ইকোপার্ক সংলগ্ন নলবুনিয়ার এই চরটি এখন অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা।

সমুদ্রের পাশাপাশি আরো অনেক কিছু দেখার সুযোগ মিলবে এখানে এলেই। অসংখ্য মৎস্যজীবীর বসবাস এই চরে। আবার শীতের মৌসুমে পর্যটকরাও সেখানে যায়। দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত, গভীর অরণ্য, বিশাল শুঁটকিপল্লী রয়েছে এই চরে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে যাওয়া মানুষ শুঁটকি উৎপাদনের জন্য চরটিতে ঘর বাঁধে। বছরে সাত থেকে আট মাস থাকে শুঁটকি উৎপাদনের ব্যস্ততা। এই চরের কাছেই রয়েছে তালতলীর বিশাল রাখাইন পল্লী। বঙ্গোপসাগরের তীরে এ পল্লী কুপিবাতি জ্বালিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলে তাঁতে কাপড় বোনার কাজ।

১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত বিবিচিনি শাহী মসজিদের সম্মুখভাগ। ছবি: উইকিপিডিয়া

বিবিচিনি শাহী মসজিদ

বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি গ্রামে টিলার চূড়ায় অবস্থিত। প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের পুরানো মোগল স্থাপত্যের এই মসজিদ ইতিহাস, স্থাপত্য এবং রহস্যের জন্য দর্শকদের আকর্ষণ করে।
বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলা সদর থেকে ১০ কিমি. (৬ মাইল) দূরে বিবিচিনি ইউনিয়নে এই মসজিদটি অবস্থিত। জানা যায়, ১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দে হযরত শাহ্ নেয়ামত উল্লাহ (র.) পারস্য থেকে এই এলাকায় ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এসে বিবিচিনিতে এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। তার কন্যা চিনিবিবি এবং ইসাবিবির নামানুসারে গ্রামের নামকরণ করা হয় এবং মসজিদটির নাম রাখা হয়েছে বিবিচিনি শাহী মসজিদ।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক মসজিদটি সংস্কার করা হয়েছে। দেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক মসজিদ হিসেবে এটি পর্যটকদের নিকট আকর্ষণীয়।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সড়ক এবং নৌপথে বরগুনায় যাওয়া যায়। ঢাকার গাবতলী ও সায়েদাবাদ থেকে ইসলাম পরিবহন, শ্যামলী এনআর ট্রাভেলস, সোনারতরী পরিবহন, দ্রুতি পরিবহন, সাকুরা পরিবহন, আবদুল্লাহ পরিবহন এবং আরো বেশকিছু বাস সার্ভিস এই পথে চলাচল করে। বাস ভাড়া লাগবে ৬৫০ টাকা থেকে ৮৫০ টাকা।

ঢাকা থেকে বরগুনা পর্যন্ত সরাসরি লঞ্চ সার্ভিসও রয়েছে, যা বিশেষ করে রাতের যাত্রার জন্য জনপ্রিয়। লঞ্চ সার্ভিসগুলো হলো— এম ভি বন্ধন -৭, যুবরাজ -৪, যুবরাজ-২, আল্লাহু মর্জি, নুসরাত ও মশিরন খান। লঞ্চে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় লাগবে। তবে সেটা নদীর অবস্থা ও লঞ্চের গতির উপর নির্ভর করে।

এসব লঞ্চের ডেকের ভাড়া ৫০০ টাকা এবং সিঙ্গেল কেবিন ভাড়া ১,৩০০ টাকা ও ডাবল কেবিন ২,৫০০ টাকা।
বরগুনা থেকে লালদিয়া বনে যাওয়ার জন্য ট্রলার এবং নৌকা ভাড়ায় পাওয়া যায়। অথবা সুন্দরবনের হরিণঘাটা দিয়ে পায়ে হেটে লালদিয়া বন ও সমুদ্র সৈকত দেখতে যেতে পারবেন।

কোথায় থাকবেন

রাত্রি যাপনের জন্য আপনাকে বরগুনা সদরে ফিরে আসতে হবে। বরগুনা শহরে থাকার জন্য বেশকিছু আবাসিক হোটেল ও রেস্ট হাউজ রয়েছে। এদের মধ্যে- জেলা পরিষদ রেস্ট হাউজ এল.জি.ই.ডি রেস্ট হাউস, পানি উন্নয়ন বোর্ড রেস্ট হাউজ, খামারবাড়ি রেস্ট হাউজ, গণপূর্ত বিভাগ, গ্র্যান্ড খান গেস্ট হাউস, বরগুনা রেস্ট হাউজ, হোটেল গ্রীনভিউ ইন্টারন্যাশনাল এ্যাগ্রো সার্ভিস সেন্টার, সি আর পি রেস্ট হাউজ, বরগুনা রেস্ট হাউজ, হোটেল তাজবিন, হোটেল আলম, হোটেল মৌমিতা, হোটেল ফাল্গুনী উল্লেখযোগ্য।