খেরুয়া মসজিদ: অবহেলায় ধুঁকছে বগুড়ার ১৬শ শতকের ঐতিহ্য

১৫৮২ সালে নবাব মির্জা মুরাদ খান কাকশালের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত মসজিদটি সুলতানি ও মুঘল স্থাপত্যশৈলীর বিরল সংমিশ্রণে নির্মিত, যার দেয়ালে এখনও ফারসি ভাষার শিলালিপি সংরক্ষিত রয়েছে

খেরুয়া মসজিদ: অবহেলায় ধুঁকছে বগুড়ার ১৬শ শতকের ঐতিহ্য
মসজিদটির দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলী ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব ধর্মীয় ঐতিহ্যে আগ্রহী দর্শনার্থীদের কাছে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত করেছে। ছবি: আসাদুজ্জামান/উইকিমিডিয়া

শেরপুরের মাটিতে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক খেরুয়া মসজিদ চার শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে।

শেরপুর উপজেলা শহর থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে শাহ বন্দেগী ইউনিয়নের খোন্দকারটোলা এলাকায় অবস্থিত মসজিদটি বগুড়ার মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের অন্যতম উৎকৃষ্ট নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত। ১৫৮২ সালে নবাব মির্জা মুরাদ খান কাকশালের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত মসজিদটির দেয়ালে এখনও ফারসি ভাষার শিলালিপি সংরক্ষিত রয়েছে। সুলতানি মুঘল স্থাপত্যশৈলীর বিরল সংমিশ্রণে নির্মিত মসজিদের নামকরণের সঠিক উৎস নিয়ে অবশ্য মতভেদ রয়েছে।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও ধীরে ধীরে জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে মসজিদটি। সবুজে ঘেরা এবং সীমানা প্রাচীরবেষ্টিত প্রায় ৪৫০ বছরের পুরোনো স্থাপনাটিতে এখন অবহেলার স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। তিনটি গম্বুজেই ফাটল ধরেছে, ফলে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি চুইয়ে ভেতরে পড়ে। নামাজ আদায়ে মুসল্লিদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর তিন দশকেরও বেশি সময় আগে স্থাপনাটির দায়িত্ব নিলেও এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের সংস্কার কাজ হয়নি।

বাইরের দেয়াল প্লাস্টার প্যানেল দিয়ে অলংকৃত, কার্নিশগুলো সোজা, আর উঁচু গম্বুজের কারণে স্থাপনাটি সুলতানি আমলের স্থাপনাগুলোর তুলনায় কম জাকজমকপূর্ণ দেখায়। ছবি: সংগৃহীত

মসজিদটি ৫৯ শতাংশ জমির ওপর অবস্থিত। ইটের গাঁথুনিতে লোহার রেলিং বসিয়ে তৈরি করা হয়েছে সীমানা দেয়াল। প্রধান ফটকের পাশে স্থাপিত একটি বড় সাইনবোর্ডে একসময় বাংলা ইংরেজিতে মসজিদের ইতিহাস লেখা ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লেখাগুলো মুছে গিয়ে এখন প্রায় অপাঠ্য হয়ে পড়েছে। ফলে গবেষকরা ঐতিহাসিক তথ্যের জন্য মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের ঐতিহ্যের স্বরূপ সন্ধানে এবং অধ্যক্ষ মোহাম্মদ রোস্তম আলীর শেরপুরের ইতিহাস (অতীত বর্তমান)’ গ্রন্থের ওপর নির্ভর করেন।

এসব সূত্র অনুযায়ী, স্থানীয় সুফি সাধক ফকির আব্দুস সামাদ ১৫৮০ সালের দিকে প্রথম মসজিদটি নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। পরে মুঘল সম্রাট জালালউদ্দিন আকবরের শাসনামলে তৎকালীন প্রাদেশিক জায়গীরদার মির্জা মুরাদ খান কাকশালের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মাণকাজ শুরু হয়।

১৫৮২ সালে সম্রাট আকবর বিতর্কিত দ্বীন--ইলাহি মতবাদ প্রবর্তন করলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। ধারণা করা হয়, মুরাদ খান কাকশালও ওই বিদ্রোহে অংশ নেন, যার ফলে মসজিদের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে সম্রাটের আনুগত্য স্বীকার করার পর পুনরায় কাজ শুরু হয় এবং মসজিদটির নির্মাণ সম্পন্ন হতে প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগে।

মসজিদটি ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে জওহর আলী খান কাকশালের পুত্র নবাব মির্জা মুরাদ খান নির্মাণ করেন। ছবি: বিদ্যুৎ খোশনবিশ/উইকিমিডিয়া কমন্স

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে মসজিদটি আয়তাকার। এর দৈর্ঘ্য ১৭.৬৭ মিটার এবং প্রস্থ ৭.৬২ মিটার। প্রায় দুই মিটার পুরু দেয়ালবিশিষ্ট মসজিদের পূর্ব পাশে তিনটি প্রবেশপথ রয়েছে, যার মধ্যে মাঝের দরজাটি অন্য দুটির তুলনায় বড় আকর্ষণীয়।

ভেতরে প্রবেশ করলে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার মেহরাব দেখা যায়, যা প্রবেশপথগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্মিত। আয়তাকার প্যানেলের ভেতরে সূক্ষ্ম অলঙ্করণে মেহরাবগুলো সাজানো হয়েছে। চার কোণে থাকা অষ্টভুজাকৃতির মিনার ছাদ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে স্থাপনাটিকে আরও দৃঢ়তা দিয়েছে। বাঁকানো কার্নিশে সুলতানি স্থাপত্যের ছাপ স্পষ্ট, যেখানে টেরাকোটার নকশাও রয়েছে। অর্ধবৃত্তাকার গম্বুজ ফুলেল অলঙ্করণ মসজিদের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়েছে।

মসজিদের ভেতরাংশ তিনটি ভাগে বিভক্ত। পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি অলঙ্কৃত মিহরাব, যার মাঝেরটি দুই পাশে ছোট দুটি মেহরাব দিয়ে ঘেরা। এখানে তিন কাতারে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করতে পারেন। স্থাপনাটিতে বড় কালো পাথরও ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি ইটের কারুকাজ উলম্ব প্যানেল নান্দনিক বৈচিত্র্য এনে দিয়েছে।

মুঘল আমলের মসজিদগুলো সাধারণত কেবল নামাজের কক্ষ নিয়েই নির্মিত হতো, যা বর্তমানে এক সারিবিশিষ্ট এবং তিন বা পাঁচটি খণ্ডে বিভক্ত। ছবি: আরিফ হোসেন/উইকিপিডিয়া

খেরুয়ানামটির উৎস নিয়েও রয়েছে নানা মত। ইতিহাসবিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া তাঁর বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আরবি ভাষায়খেরুয়াশব্দের কোনো অর্থ নেই। তবে ফারসি ভাষায়খাইর গাহঅর্থকোনো স্থানের অভ্যন্তরে কিছু ইতিহাসবিদের ধারণা, মসজিদটি একসময় শেরপুর দুর্গের ভেতরে ছিল, যা বাংলার সুবাদার রাজা মানসিংহ নির্মাণ করেছিলেন। যদিও দুর্গটির আর অস্তিত্ব নেই, তবেখাইর গাহথেকেই হয়তোখেরুয়ানামের উৎপত্তি।

মসজিদের খাদেম আব্দুস সামাদ বলেন, দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিদিন বহু দর্শনার্থী এখানে আসেন।মুসলিম স্থাপত্য সম্পর্কে জানতে ঐতিহাসিক কৌতূহল মেটাতেই মানুষ এখানে আসে,” বলেন তিনি।

তাঁর মতে, মসজিদে যাওয়ার সড়ক সংস্কার এবং আশপাশে বড় বড় ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে পর্যটক আরও বাড়বে।

বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, স্থানীয় সুফি সাধক ফকির আব্দুস সামাদ প্রথম ১৫৮০ সালের দিকে মসজিদ নির্মাণের স্বপ্ন দেখেন। ছবি: সংগৃহীত

মসজিদের মুয়াজ্জিন জুবায়ের জানান, এখানে নিয়মিত জামাতে নামাজ আদায় হয়। রমজানে তারাবিহ ঈদের নামাজও অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বলেন, “বর্ষাকালে গম্বুজ দিয়ে পানি পড়ে। দ্রুত সংস্কার না হলে মসজিদটি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।

বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে তিনি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রতি আহ্বান জানান।

শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আলম মসজিদটির বেহাল অবস্থার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “প্রায় ৪৫০ বছরের পুরোনো খেরুয়া মসজিদের অবস্থা অনেকটাই খারাপ হয়ে গেছে। তবে এটি সংরক্ষণে উপজেলা প্রশাসন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর উদ্যোগ নিচ্ছে।

এখনও খেরুয়া মসজিদ একদিকে যেমন মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শন, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অবহেলার প্রতীক। এর ফেটে যাওয়া গম্বুজ মলিন হয়ে যাওয়া শিলালিপি যেমন ইতিহাসের স্থিতিশীলতার গল্প বলে, তেমনি সংরক্ষণের জরুরি প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেয়।